হাইস্কুলের প্রেম!
কখন যে সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া বালক ফ্রক পড়া
বালিকার প্রেমে পড়ে যায় ঠিক বোঝা যায়না! কোচিং ফাঁকি দিয়ে, বালক হেঁটে বেড়ায়
বালিকার বাসার অলিতে গলিতে। হয়তো কোন এক দুর্লভ মুহূর্তে বালিকা ব্যালকনিতে আসবে,
বেণী খোলা চুল ভাসিয়ে দিবে দক্ষিণের বাতাসে। ক্ষণিকের দেখা পাওয়া! এতোটুকুই তো
চাওয়া! এতেই বালকের রাতের ঘুম শেষ! অংকে ভুরি ভুরি ভুল, বিজ্ঞানের ক্লাসে কান ধরে
দাঁড়িয়ে থাকা!
দিন যেতে থাকে। বালক, বালিকার পেছনে আঠার মতো
লেগে থাকে। কোন একদিন বালিকারও ভালো লাগে যায় বালককে। সদ্য গোফের রেখা গজানো,
শার্টের বোতাম খোলা বালককে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ। বালিকা কলমের
ক্যাপ কামড়িয়ে কামড়িয়ে বাকা করে ফেলে। কিছুতেই মন বসেনা পড়ার টেবিলে।
একদিন মুখোমুখি দাঁড়ায় দুজন।
কিছুক্ষণের জন্যে নেমে আসে মহাজাগতিক
নীরবতা।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শতবার রিহারসেল দিয়ে আসার
পরেও বালকের কথা আটকে যায়। গলা শুকিয়ে যায়। নার্ভাস লাগে।
বালিকা বালকের করুণ অবস্থা বুঝে ফেলে নিমিষেই।
ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে রেখে বালিকা কঠিন স্বরে বলে, ‘ এই ছেলে
এতো ভয় পাচ্ছো কেন? আমি কি বাঘ? খেয়ে ফেলব’?
বালক আরো নার্ভাস হয়ে যায়।
বালিকা ফিক করে হেসে ফেলে...
বয়ঃসন্ধিকালীন প্রেমের জটিলতা, অস্থিরতা,জীবন
ধ্বংসের অন্যান্য আরোদিক খুব সযত্নে লুকিয়ে
গল্প উপন্যাস মুভি সিরিয়ালে রোমান্টিসিজমের চাদরে মুড়িয়ে খুবই ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রথম ভালোলাগা, প্রথম
ভালোবাসা, প্রথম কাছে আসা, প্রথম স্পর্শ...... সব মিলিয়ে নিদারুণ সুখের এক কমপ্লিট
প্যাকেজ।
মেয়েদের উপস্থাপন করা হয় ‘রানী’ হিসবে। ছেলেরা
প্রজা,ছেলেরা দাস। কিশোরী,তরুণীদের পটানোর জন্য ছেলেরা পাগলামি করে বেড়াচ্ছে,কবিতা
লিখছে, গান বাঁধছে, দূর আকাশের চাঁদটাও চুরি করে আনার প্রতুস্তুতি দিচ্ছে। শেষমেষ হাঁটু গেড়ে বসে ভালোবাসার কথা জনাচ্ছে।।
কিশোর,তরুণদের সকল প্রচেষ্টা, সকল কর্মকাণ্ড ঘরছে কিশোরী, তরুণীদের হৃদয় দখলকে কেন্দ্র
করে।
দীর্ঘসময় ধরে মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া সম্ভব
হলেও এই হাইপার সেক্সুয়ালাইজড সমাজে ঠিক বের হয়ে এসেছে প্রেমের আসল চেহারা,
পঁচে,গলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে জানান দিচ্ছে এর বীভৎস অবস্থা।
আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি পর্নআসক্তি খুব দ্রুত শিশু
কিশোরদের বাস্তব যৌনতার দিকে ঠেলে দেয়।
আর এর ফলে মেয়েদের ওপর তীব্র প্রেসার পড়ে।

কিশোরেরা অন্তরঙ্গতার জন্যে কিশোরীদের চাপ দিতে থাকে। রাজি
না হলে কিশোরীদের নিয়ে রসালো মন্তব্য করা হয়, কিশোরীদের পবিত্র থাকার আকুতিকে
ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ঠাট্টা উপহাস করা হয় ।[২৪]
বয়ফ্রেন্ড,গার্লফ্রেন্ডের আবেগ নিয়ে খেলা করে,ব্ল্যাক মেইল
করে,‘ তুমি আমাকে যদি সত্যিকারের ভালোবাস তাহলে আমাকে তোমার টপলেস একটা ছবি
পাঠাও’। টপলেস ছবি প্রযুক্তির কল্যানে ঘুরতে থাকে অন্য ছেলেদের ফোনেও, ছবি দেখে
ফ্যান্টাসীতে ভোগা হয়, করা হয় মাস্টারবেশন। অন্য ছেলেরা এসব ছবি ব্যবহার করে
ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে।
গার্লফ্রেন্ড বিছানায় যেতে রাজি না হলে কিশোরেরা সম্পর্ক
টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।মেয়েরাও অন্য ছেলেদের কাছে পাত্তা পায়না
যদিনা তারা তাদের টপলেস ছবি ছেলেদের কাছে না পাঠায়, বা বিছানায় যেতে আগ্রহী হয়।
শেষমেশ বাধ্য হয়ে ছেলেদের প্রস্তাব মেনে
নিতে হয়। নিজের শরীর তুলে দিতে হয় ছেলেদের হাতে।
গত ৬০ বছরে ভার্জিনিটি
হারানোর বয়স ১৯ থেকে নেমে ১৬ তে এসেছে।“ডলি ম্যাগাজিন” এর তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালে ৫৬% কিশোরকিশোরী মাত্র ১৩-১৫ বছর বয়সেই নিজেদের দেহকে তুলে
দিয়েছে অন্যের হাতে। অস্ট্রেলিয়ান এক গবেষণায় দেখা যায়, মেয়েদের জীবনের প্রথম
যৌন অভিজ্ঞতা হয়েছে ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে।গড় বয়স ছিল ১৪ এর মত।[২৫]সেই সঙ্গে বাড়ছে গর্ভপাতের পরিমাণ। জন্মের ছাড়পত্র না পেয়ে
প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশু যায়গা করে
নিচ্ছে রাস্তার ডাস্টবিন আর টয়লেটের কমোডে।বিছানায়
বয়ফ্রেন্ডের যেকোন আবদার মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে মেয়েরা- হোক সেটা ওরাল সেক্স বা
এনাল সেক্স বা গ্রুপ সেক্সের মতো বিকৃত
যৌনাচার।[২৬,২৭,২৮]
কিশোরদের
নিকট এনাল এবং ওরাল সেক্স খুবই জনপ্রিয়। Journal Adolescent Health এ প্রকাশিত গবেষণা
থেকে ১৬-১৮ বছর বয়সীদের মধ্যেই এনাল এবং ওরাল সেক্স সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।
১৯৯০
সালে যেখানে প্রতি ১০ জন কিশোরীদের একজনের এনাল সেক্সের অভিজ্ঞতা থাকতো সেখানে
বর্তমানে প্রতি ৫ জন কিশোরীদের মধ্যে ১ জনের এনাল সেক্সের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা
বলছেন এনাল সেক্সের এই নাটকীয় উত্থানের
জন্য দায়ী পরনোগ্রাফি। [২৯,৩০]
ছেলেরা এনাল সেক্স
নিয়ে অন্য ছেলেদের সঙ্গে গর্ব
করছে, ‘আমি এতো এতো বার এনাল সেক্স করেছি’ ।[৩১]
পর্নআসক্ত কিশোর-তরুণদের সঙ্গে তাল মেলাতে যেয়ে
কিশোরী তরুণীদের জীবন ‘ছ্যাড়াব্যাড়া’ করে ফেলেছে। পর্দার পর্নস্টারের মতো দেহ ছাড়া তারা ছেলেদের কাছে পাত্তা
পাচ্ছেনা;তুমি উগ্র পোশাক আশাক পড়োনা, তোমার শরীর পর্ন অভিনেত্রীদের মতো না তার মানে তুমি কুৎসিত, তোমার দিকে কেউ ঘুরেও
তাকাবে না। নিরুপায় হয়ে তারা পর্নস্টারের
সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। খেয়ে না খেয়ে, ডায়েট পিল খেয়ে, সার্জারি করে পর্নস্টারের
মতো হবার চেষ্টা করছে। এক দশকের একটু বেশি
সময়ে ১৫-২৪ বছর বয়সীদের genital surgery করার প্রবণতা বেড়েছে তিনগুনেরও বেশি।কিশোরী তরুণীরা তাদের নিজেদের
শরীরকে ঘৃণা করছে। বাড়ছে প্লাস্টিক সার্জারি, বাড়ছে বক্ষ স্ফীতকরণের পরিমাণ। [৩২]
এনাল সেক্স, ওরাল সেক্সের মাধ্যমে
কিশোরীরা দৈহিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার
হচ্ছে। মলাশয়ের টিস্যু ছিড়ে যাচ্ছে, প্রস্রাব-পায়খানা করার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে
ফেলছে, এমনকি তাদের এজন্যে colostomy ব্যাগ (https://en.wikipedia.org/wiki/Colostomy
) ব্যবহার করতে হচ্ছে। ওরাল
সেক্সের কারণে HPV ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। গলায় ক্যান্সার হবার কারণে অনেককেই সার্জারির আশ্রয়
নিতে হচ্ছে।[৩৩]
কিশোরীরা- তরুণীরা ভুগছে অস্থিরতা,উদ্বিগ্নতা,
হতাশা আর বিষণ্ণতায়। বাড়ছে আত্মহত্যার পরিমাণ, ড্রাগ নেওয়া।মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১১-১৩ বছর বয়সী
কিশোরীদের মানসিক সমস্যা বেড়ে গেছে বহুগুন যা Journal of
Adolescents Health এর বিশেষজ্ঞদেরক পর্যন্ত বিস্মিত করে দিয়েছে।[৩৪]
১৫ বছরের এক কিশোরীকে তার প্রথম অন্তরঙ্গতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা
হয়েছিল, জানতে চাওয়া হয়েছিল তার অভিজ্ঞতা।
নিরীহ মুখে সে জবাব দিয়েছিল ,‘ আমার মনে হয়
আমার সঙ্গী ব্যাপারটি উপভোগ করেছে। আমার শরীর ঠিক তেমনটাই ছিল যেমনটা সে আশা করে’!
[৩৫]
চিন্তা করুন, একবার পর্নমুভি ভয়াবহতা! পর্নমুভি
এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যেখানে কিশোরী তরুণীদের অবকাশ নেই নিজের সুখের
ব্যাপারে চিন্তা করার। তাদের প্রধান চিন্তা সঙ্গীদের সুখ দেওয়ায়। এই pornified সমাজে কিশোরী, তরুণীরা খুব অল্পদিনেই ধরে ফেলে সমাজের মূল মেসেজটা- ‘তুমি
নারী, পৃথিবীতে তোমার আগমন ঘটেছে পুরুষদের সুখ দেওয়ার জন্য, সে তোমাকে যেভাবে
ইচ্ছে সেভাবে ব্যবহার করবে। তুমি তোমার
নিজের সুখের ব্যাপারে চিন্তা করতে পারবেনা, তোমার সকল চিন্তা ভাবনা আবর্তিত হবে
সঙ্গীকে সুখ দেওয়াকে কেন্দ্র করে’।
কিশোরী, তরুণীদের চাওয়া তো খুব বেশি ছিলনা ,
একজন কেয়ারিং সঙ্গী যে তাকে বুঝতে পারবে, তাকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে রাখবে, যার
কাঁধে পরম নির্ভাবনায় মাথা রাখা যাবে!
এই হাইপার সেক্সুয়ালাইজড সমাজ তাদেরকে সুখের
স্বপ্ন দেখিয়ে, ভালোবাসার ফানুস উড়াতে ইন্ধন দিয়ে বের করে নিয়ে আসলো ঘরের বাহিরে।
ছলে বলে কৌশলে কাপড় খুলিয়ে পরিবেশণ করলো পুরুষের প্লেটে। এক আকাশ স্বাধীনতার
প্রলোভন দেখিয়ে বানিয়ে ফেলল পুরুষের
যৌনদাসী!
ছেলেরা যখন থেকে মেয়েদের ‘Slave’ হিসেবে দেখা শুরু করল, যখন থেকে এই সমাজ মেয়েদের ‘যৌনদাসী’ বানিয়ে ফেলল
তখন থেকেই মেয়েরা বুঝে ফেলল, তার শরীর তার সম্পদ, এই বিরুদ্ধ পরিবেশে লড়াই করার
একমাত্র হাতিয়ার। মেয়েরা তাদের শরীর ব্যবহার শুরু করল, হতে থাকলো লাস্যময়ী যেন
যৌবন জ্বালায় বিকারগ্রস্থ ছেলেদের চড়কির মত ঘোরানো যায়! নেওয়া যায় অনেক সুযোগ
সুবিধা!
ছেলেদের সামনে
মেয়েরা দাঁড়িয়ে গেল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।
যেই সম্পর্ক ছিল ভালোবাসার, পবিত্রতার,
বিশ্বস্ততার, সহযোগিতার সেই সম্পর্ক হয়ে গেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। স্বার্থপরতা,
প্রতারণা, ছলাকলার!
(শেষ)
পড়ুনঃ
রেফারেন্সঃ
[৩১] Cicely Alice Marston and Ruth Lewis. “Anal
Heterosex Among Young People and Implications for Health Promotion: A
Qualitative Study in the UK,” BMJ Open 4, no. 8 (2014).
No comments:
Post a Comment